নিরবিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক বালুকাময় সমুদ্র বিলাসে বন্ধুরা সবাই

নিরবিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক বালুকাময় সমুদ্র বিলাসে বন্ধুরা সবাই
ভ্রমণ মনের আনন্দের খোরাক জোগায়,অজানাকে জানার জন্য, নতুন মানুষের সাথে পরিচয় ও মানুষের জীবনধারা সম্পর্কে জানতে ভ্রমণের বিকল্প নেই। জুলাই-আগস্ট মাসের বর্বরতা ও নিজ চোখে সহপাঠীদের মৃত্যু দেখে সবাই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে ছিলো। দীর্ঘদিন পর বিশ্ববিদ্যালয় খোলার সাথে সাথে পরীক্ষার চাপ ও অনেকদিনের আক্ষেপ ব্যাচ ট্যুরের তাই পরীক্ষা শেষ হওয়া মাত্রই ব্যাচের একাংশ মিলে সিদ্ধান্ত নেয় এবার একটা সফর হওয়া বাঞ্ছনীয়।
একসাথে ভ্রমণের সিদ্ধান্ত হলেও বিপত্তি বাঁধে ভ্রমণের স্থান নির্বাচনে ও ট্যুর কতদিনের হবে তা নিয়ে। কেউ যেতে চায় একদিনের কেউবা কয়েকদিনের, কারো মনের ইচ্ছে সমুদ্র কেউবা পাহাড় দেখতে যেতে চায়। অনেক জল্পনা-কল্পনা ও আলোচনার মাধ্যমে অবশেষে নির্ধারন হয় আমরা সমুদ্র দেখতে যাবো।বাংলাদেশে সমুদ্র দেখতে যাবার কথা বললেই সবার মনে একটা জায়গার নামই আসে তা হলো কক্সবাজার। ভ্রমণের স্থান ঠিক হয় পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার আর সেখানে আমরা দুদিন এবং একরাত্রি যাপন করবেো।কক্সবাজার সবারই কয়েকবার করে দেখা হলেও প্রতিবারই সমুদ্র সৈকত নতুন রুপে ধরা দেবেই, কেননা সমুদ্র জীবনের কথা বলে কিনা!
ভ্রমণ আয়োজনের সকল দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয় আমাদের মোহাম্মদ রোহান রাব্বী,সে কয়েকজনকে সাথে নিয়ে রিসোর্ট, খাওয়ার হোটেল, গাড়ির ব্যাবস্হাসহ পুরো ভ্রমণের পরিকল্পনা তৈরি করে ফেলে। সেই মোতাবেক সবার মধ্যে সমুদ্রবিলাসের আমেজ তৈরি হয়।
কক্সবাজার বঙ্গোপসাগরের সৌন্দর্য অবলোকনের সবচেয়ে সুন্দর ও জীববৈচিত্র্যে ভরপুর পৃথিবীর দীর্ঘ নিরবিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক বেলাভূমি। ১২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই সমুদ্র সৈকতের পাশে রয়েছে পাহাড় ও ঝাউবনের পসরা। অতীতে কক্সবাজার ‘পানুয়া’ নামে পরিচিত ছিলো। মুঘল সম্রাট শাহজাহানের পুত্রের ভ্রমণের সময় নাম হয় ‘পালঙ্কি’। পরবর্তীতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিযুক্ত মহাপরিচালক ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স, তিনি আরাকান ও রাখাইনদের মধ্যকার হাজার বছরের পুরোনো সংঘাত নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাই তার সম্মাননায় এই এলাকার নাম হয়ে যায় কক্সবাজার। সৈকত ছাড়াও কক্সবাজারে রয়েছে ঝরনা, পাহাড়, এবং সুন্দর বন। সমুদ্রের পাড়ে সময় কাটাতে এখানে সৈকতে হাঁটা, সাঁতার কাটা, সার্ফিং করা, এবং সূর্যাস্ত দেখা ইত্যাদি কাজ করার সুবিধা রয়েছে। কক্সবাজারে যাওয়ার সেরা সময় হল শীতকাল (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি)। এই সময় আবহাওয়া ও পরিবেশ খুবই সুন্দর ও স্নিগ্ধ হয়।
অবশেষে চলে আসে সেই কাঙ্খিত দিন, নভেম্বরের সাত তারিখ রাতে সবাই একে একে এসে উপস্থিত হয় বাস কাউন্টারে, কেউ ক্যাম্পাস কেউবা মেস থেকে।এজন্য ভ্রমনজনিত সকল কিছু নিয়ে আগের দিন রাতেই অনলাইনে আলোচনা করে ফেলি আমরা। আমরা মোট ১৮ জন একত্রিত হলে বাস কুমিল্লা থেকে তার গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। বাসে উঠেই সবাই হৈ হুল্লোড় মেতে ওঠে এবং ভোর পাঁচটার দিকে আমাদের সবাইকে গাড়ি নামিয়ে দেয় লাবনী পয়েন্টের কাছেই।ঘুম ঘুম চোখে আগে থেকে বুকিং করা হোটেলে সবাই চলে আসি।
সবাই রুমে উঠে ফ্রেশ হয়ে সকালের খাবার খাওয়ার আগেই ঘুরতে চলে যাই কক্সবাজারে লাবনী পয়েন্টের সমুদ্র পাড়ে। সমুদ্রের পাশে গিয়ে ডুবে যাই তার ঢেউয়ের কলতানে।সমুদ্র অনুপ্রস্থ তরঙ্গের সাহায্যে বিমোহিত করে তুলছে একঝাঁক ভ্রমণ পিপাসুদের। এরপর এসে সকালের খাওয়া সেরে একটু রেস্ট নিয়ে এবার নেমে পড়ি সমুদ্র স্নানে।সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথে সব বন্ধুরা তাল মিলিয়ে দাপাদাপি করি প্রায় ২ ঘন্টারও বেশি সময় ধরে। এরপর নামাজ আদায় শেষে দুপুরের খাবারের পর পুনরায় সমুদ্রে নেমে পড়ি। রৌদ্র ক্ষয়িষ্ণু দুপুরে সমুদ্রে তখন জোয়ার এসেছে,পানির সাথে ঢেউয়ের উচ্চতাও বৃদ্ধি পেয়েছে তাই আমরা বেশিদূর এগোই নি সবাই কাছাকাছি ছিলাম ও মজা করছিলাম। হঠাৎ দেখি কয়েকজন ডুবে যাচ্ছে প্রথমে না বুঝতে পারলেও পরে বুঝতে পেরে ফরহাদ, রোহান ও নাইম টিউব নিয়ে এগিয়ে যায় এবং তাদেরকে উদ্ধার করে। একসময় সূর্য ঢলে পড়ে তলিয়ে যেতে থাকে সমুদ্রের অতল গহ্বরে, আমরা সাক্ষী হই দিনের সবচেয়ে সুন্দর মুহুর্তের। সূর্য ডুবে গেলে একে একে সবাই চলে আসি রুমে ফ্রেশ হয়ে সবাই কৃত্রিম ফিশ একুরিয়াম দেখতে গেলেও আমি মারুফ ও নাইম বেরিয়ে পড়ি রাতের কক্সবাজার দেখতে। বাজারে বিভিন্ন জিনিস দেখতে দেখতে হেটেই চলে আসি সুগন্ধা বিচ পয়েন্টে, চাঁদের আলোয় সমুদ্র সৈকতের দৃশ্য উপভোগ করি।অন্যরা ফিরে আসলে পুর্বে ঠিক করা রেস্তোরাঁয় সবাই মিলে রাতের খাবার সেরে আবারো সমুদ্রের গর্জন শুনতে কেউ চলে যায় সৈকতে কেউবা রুমে এসে গান বাজনা করে বা ঘুমিয়ে পড়ে। আমি সচরাচর ভ্রমণে গেলে রাতেও ঘোরাঘুরি করি কিন্তু এবার খুব বেশি ক্লান্ত থাকায় তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ি কারণ বৃহস্পতিবার দিনে লেখক ফোরামের চড়ুইভাতি আয়োজনের দায়িত্ব আমার ছিলো।
পরের দিন সকালে উঠেই সমুদ্রে পাড়ে ঘুরতে চলে যাই যদিও আমার ঘুম ভাঙতে দেরী হয়। এরপর সকালের খাওয়া সেরে আবারো বেলাভূমিতে চলে যাই সবাই। কেউ ঝাউবনে, কেউ সৈকতের সামনে ছবি ও সেই সাথে আড্ডা দিতে থাকে। যেহেতু মেয়েরা শাড়ী পরেছিলো তাই তাদের মাঝে ছবিতোলার উৎসব শুরু হয়। আমি সৈকতের পাড় ধরে হাটতে থাকি যতদূর যাওয়া যায় পথিমধ্যে কয়েকটা পিচ্চির সাথে তাদের সাথে কিছুক্ষণ আড্ডা দেই। সকাল ১১টা পর্যন্ত এভাবেই আমাদের বিচ্ছিন্নভবে ঘুরাঘুরি চলে তারপর সবাই রুমে এসে পরবর্তী অংশের প্রস্তুতি নেয়। চাদের গাড়ি নিয়ে বেলা ১২ টায় যাত্রা শুরু করবার কথা থাকলেও গাড়ি না আসায় বিলম্ব হয় পরবর্তীতে আবার অন্য চাদের গাড়ি ঠিক করে তৎক্ষনাৎ বেরিয়ে পড়ি আমরা। যাত্রার শুরুতেই ডলফিন মোড়ের ইউটার্ন থেকে সমুদ্রের দৃশ্য নজরকাঁড়া ছিলো যা সবার মনকে পুলকিত করে তোলে।এরপরে সমবেত সুরে গান গাইতে গাইতে এসে পৌছাই হিমছড়ি শুরু হয় পর্বতারোহণ।এই পাহাড়ের বিশেষত্ব হচ্ছে একপাশে থেকে সমুদ্র অপর পাশে থেকে সবুজ বন দেখা পাওয়া যায়। ওখান থেকে নেমে কৃত্রিম ঝর্ণা দেখে মেরিন ড্রাইভ রোড ধরে এগিয়ে যাই আমরা। সালসা বিচে গিয়ে আবারো গাড়ি থেকে নেমে কাঠের সেতু ও ঝাউবন পেরিয়ে সমুদ্রের পাড়ে গিয়ে পৌঁছে যাই, সেখানে কয়েকজন প্যারাসেইলিং করে। আবারো তড়িঘড়ি করে এসে চাদের গাড়িতে উঠে সামনে এগিয়ে যাই আমরা, পথিমধ্যেই গাড়িতেই দুপুরের নাস্তা সেরে ফেলি কেননা সবার মধ্যে টানটান উত্তেজনা পরবর্তী স্হান নিয়ে তাই বেশিরভাগই খাবারের কথা বেমালুম ভুলে গেছিলাম।একপাশে সমুদ্রতট ও অপরপাশে লোকালয় ও ঝাউবন দেখতে দেখতে রেজু খাল ব্রীজ পার হই। কিছুদূর এগিয়ে সামনে গেলে ইনানী বাজার পরবর্তীতে ইনানী বিচের দেখা পাই কিন্তু সেখানে না থেমেও এগিয়ে যাই আমরা এবং পাটুয়ারটেক বিচে গিয়ে থামি।ততক্ষণে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। পথিমধ্যে ইনানী বিচের লঞ্চঘাটটি ভেঙে ফেলা হচ্ছে দেখে আমার মনটা খারাপ হয়ে যায় তবে ভালোলাগাটুকু হলো পরিবেশের রক্ষার জন্যই তা নাকি ভেঙে ফেলা হচ্ছে। পাটয়ারটেক বিচ থেকে আমরা আবারো গোল্ডেন মোমেন্টের স্বাক্ষী হয়। আমার কাছে মনে হয় সমুদ্রতটের বিভিন্ন জায়গা থেকে সূর্যাস্তের দৃশ্য একেবারে যেন ভিন্ন।
চারদিকে অন্ধকার নেমে আসলে আমরা চান্দের গাড়ির কাছে এসে মামাকে খোজা শুরু হয়। তারপর গাড়ি চলতে শুরু করলে সবাই মিলে বেসুরো গলায় গান ধরি যা থামার নামই নিচ্ছিল না।গান করতে করতে কখন আবারো সুগন্ধা পয়েন্টে চলে এসেছি বুঝতে পারি নাই। এরপর খাওয়া দাওয়া করে সবাই কেনাকাটার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। আমি আগে কিছু কিনলেও আবারও রাতের কক্সবাজার দেখার লোভ সামলাতে পারি নাই তাই বেরিয়ে পড়ি।রাতের ফেরার টিকিট আগে থেকেই ঠিক করা ছিলো তাই সবাই সবকিছু নিয়ে যথাসময়ে উপস্থিত হয়ে যাই বাসস্ট্যান্ডে। ভোরবেলায় চোখ মেলে দেখি কুমিল্লা শহরে পৌঁছে গেছে বাস সবাই নেমে যার যার গন্তব্যে চলে যাই শেষ হয় কাঙ্ক্ষিত ট্যুর।
আমাদের দেশে দিনে দিনে ভ্রমণ পিপাসুদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে কিন্তু সেই তুলনায় পর্যটন স্হানসমূহের আধুনিকীকরণ ও উন্নতি খুবই নগন্য। দর্শনীয় স্থানগুলোতে দেশী-বিদেশী পর্যটকরা নানামুখী সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে যার ফলে তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। সেই সাথে পর্যটন স্হানগুলোর পরিবেশ বিপর্যস্ত হচ্ছে তাই আমাদের সরকারের অতিসত্বর দেশের পর্যটন শিল্পের দিকে নজর দিতে হবে। পর্যটকদের নিরাপত্তাসহ সকল সুবিধা নিশ্চিত করা, পরিবেশ রক্ষায় পদক্ষেপ এবং স্থানগুলোর উন্নতি সাধন করা জরুরি।
আল মাসুম হোসেন
শিক্ষার্থী, ফার্মেসী বিভাগ
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
01618600028
hossainmasum022@stud.cou.ac.bd

