শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

ন্যায়কে ন্যায় ও অন্যায়কে অন্যায় বলাই প্রকৃত শিক্ষিতদের পরিচয় 

Author

আল মাসুম হোসেন , কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ১৮ মার্চ ২০২৬ পাঠ: ১৮৫ বার

সমাজে আমরা প্রায়শই নিজেদের “শিক্ষিত” বলে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করি। পরিসংখ্যান বলছে, শিক্ষার হার বাড়ছে, উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণও আগের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই শিক্ষা কি আমাদের নৈতিকভিত্তি শক্তিশালী করছে? আমরা কি সত্যিই ন্যায়কে ন্যায় এবং অন্যায়কে অন্যায় বলতে শিখছি, নাকি কেবল ডিগ্রির বোঝা বাড়াচ্ছি?

 

আমরা সবাই জানি খুন, গুম, ধর্ষণ, দুর্নীতি ইত্যাদি সব ভয়াবহ অপরাধ। এসবের প্রতি আমাদের স্বাভাবিক ঘৃণা কাজ করে। আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করি, অপরাধীদের শাস্তি দাবি করি। কিন্তু বাস্তব জীবনে যখন অন্যায় আমাদের সামনে ঘটে, তখন কি আমরা একইভাবে সোচ্চার হই? নাকি নীরব থাকি?প্রকৃতপক্ষে, অন্যায়কে শুধু ঘৃণা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান না নেওয়াও এক ধরনের অন্যায়। যখন আমরা চুপ থাকি, তখন আমরা সরাসরি অপরাধ না করলেও পরোক্ষভাবে সেই অপরাধকে শক্তি দিই। কারণ অন্যায়কারীরা সবচেয়ে বেশি সাহস পায় সমাজের এই নীরবতা থেকে।

 

ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, বড় বড় অন্যায়ের পেছনে শুধু অপরাধীরাই দায়ী ছিল না, বরং দায়ী ছিল অসংখ্য নীরব দর্শকও। যারা অন্যায় দেখেও মুখ খোলেনি, প্রতিবাদ করেনি, নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে চুপ থেকেছে তারাই একসময় অন্যায়ের বিস্তারকে সহজ করে দিয়েছে।

 

আমাদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায় কেউ অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে তাকে “ঝামেলাপ্রিয়”, “বেশি কথা বলে” বা “নিজেকে বড় কিছু মনে করে” বলে তুচ্ছ করা হয়। ফলে অনেকেই সচেতনভাবে নীরব থাকার পথ বেছে নেয়। কিন্তু এই নীরবতাই ধীরে ধীরে অন্যায়কে স্বাভাবিক করে তোলে। আজ যেটা দেখে আমরা চুপ থাকছি, কাল সেটাই আমাদের নিজেদের জীবনে আঘাত হয়ে ফিরে আসতে পারে। আমাদের সমাজের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা বুঝে হোক না বুঝে কিংবা নিজ স্বার্থের জন্য অন্যায়ের পক্ষ নিয়ে থাকি।

 

শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কেবল তথ্য জানা নয়, বরং সঠিক ও ভুলের পার্থক্য বোঝা এবং সেই অনুযায়ী অবস্থান নেওয়া। যদি একজন মানুষ অন্যায় দেখেও চুপ থাকে, তবে তার শিক্ষা অপূর্ণ। কারণ প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে সাহসী করে, ন্যায় প্রতিষ্ঠার শক্তি দেয় এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মানসিকতা গড়ে তোলে।

 

সমাধান হিসেবে প্রথমেই প্রয়োজন ব্যক্তিগত সচেতনতা। আমাদের প্রত্যেকের উচিত ছোট ছোট অন্যায়ের বিরুদ্ধেও অবস্থান নেওয়া। সেটা শুরু হোক পরিবারে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বা সমাজে। আপনার নিজের সন্তান বা ভাই অর্থাৎ আপনার ছোটোজনকে অবশ্যই অন্যায় ও ন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য করতে শিখান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুধু প্রতিবাদ না করে বাস্তব জীবনেও নৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও প্রয়োজন এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে মানুষ নির্ভয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারে। আইনের সঠিক প্রয়োগ, ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচারের দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।

 

পরিশেষে মনে রাখতে হবে, অন্যায় শুধু অপরাধীর কারণেই টিকে থাকে না; এটি টিকে থাকে আমাদের নীরবতার ওপর ভর করে। তাই এখনই সময় আমরা নিজেদেরকে প্রশ্ন করি, আমরা কি সত্যিই শিক্ষিত, নাকি শুধু শিক্ষার নাকাব পরে আছি? মনে রাখতে হবে, অন্যায় শুধু অপরাধীর কারণেই টিকে থাকে না; এটি টিকে থাকে আমাদের নীরবতার ওপর ভর করে। তাই এখনই সময় আমরা নিজেদেরকে প্রশ্ন করি, আমরা কি সত্যিই শিক্ষিত, নাকি শুধু শিক্ষার নাকাব পরে আছি?

লেখক: সভাপতি, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!