জুলাই সনদ: পতনের পর প্রত্যাশার পূনর্জন্ম

জুলাই সনদ: পতনের পরে প্রত্যাশার পুনর্জন্ম (প্রকাশিত: ০১ আগস্ট,২০২৫ ইংরেজি। প্রতিদিনের সংবাদ)
কোনো কোনো সময় একটি জাতির সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায় থেকেই জন্ম নেয় তার নতুন দিনের আলোকছায়া। ঠিক তেমনই এক অবিস্মরণীয় দিন বাংলাদেশের ইতিহাসে ৫ আগস্ট ২০২৪, যেদিন দীর্ঘ সময়ের ফ্যাসিবাদী শাসনের পর্দা নামিয়ে দেয় এক অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থান।
এটি কেবল একটি সরকারের পতন ছিল না; বরং এটি ছিল একটি ভঙ্গুর ও ব্যর্থ রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের নির্ভীক ও সুস্পষ্ট রায়। যেথায় ক্ষোভ, বঞ্চনা, অন্যায় ও অবহেলার দীর্ঘ ইতিহাস জমা হয়ে বিস্ফোরিত হয়েছিল ক্লাসরুম থেকে রাজপথে, নাট্যমঞ্চ থেকে কর্মক্ষেত্রের প্রতিটি প্রান্তে। এই অভ্যুত্থান ছিল মানুষের দীর্ঘদিনের চাপা যন্ত্রণার এক দ্রোহী প্রতিক্রিয়া যা গড়ে তুলেছিল স্বাধীন, ন্যায়ভিত্তিক এক নতুন রাষ্ট্রের স্বপ্ন। অভ্যুত্থানে প্রায় দুই হাজারের মতো মানুষ প্রাণ হারান, আরও কয়েক হাজার মানুষ আজীবনের জন্য পঙ্গুত্ববরণ করেন। শুধু একটি নতুন ভোরে নতুন সূর্যদয়ের জন্য জাতিকে দিতে হয়েছে এক করুন মূল্য।
এই অভ্যুত্থানের বৈধতা এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তার ক্লিয়ার রূপরেখা নির্ধারণ করতে যে ঐতিহাসিক দলিলটি আমাদের প্রয়োজন,সেটিই হলো-‘জুলাই সনদ’। এই সনদ শুধু অভ্যুত্থানের একটি প্রামাণ্য দলিল হিসেবে নয়, এটি হবে একটি জাতীয় চুক্তিপত্র যেখানে আমাদের প্রতিশ্রুতি দিবে ‘একটি নতুন সম্ভাবনা ও একটি নতুন রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি রচনার সাহসী ইশতেহার।
আজ, যখন জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্ক চলছে, তখন আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব ২৪-এর গণ অভ্যুত্থানকে স্মরণ করা ও এই সনদের মূল লক্ষ্য ও চেতনা গভীরভাবে উপলব্ধি করা। গণতান্ত্রিক কাঠামো রক্ষা, জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ এবং স্বাধীন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যে সংকল্প জাতি এই সনদের মাধ্যমে আকাঙ্কা করছে তা যেন শুধু কাগজে না থেকে বাস্তব রূপ পায় সেটি নিয়ে কাজ করা।
কারণ,বিশ্ব ইতিহাসে যুগান্তকারী সনদগুলো কখনো কেবল আইনগত নথি ছিল না। এগুলো হয়ে উঠেছিল সময়ের দর্পণ, ভবিষ্যতের রাষ্ট্রীয় নকশা এবং রাজনৈতিক নৈতিকতার ঘোষণাপত্র। ১২১৫ সালের ম্যাগনা কার্টা যেখানে বিদ্রোহী ব্যারনদের চাপে রাজা জন প্রথমবারের মতো স্বীকার করেন যে, শাসকও আইনের ঊর্ধ্বে নয়। যদিও তখন এই দলিল কেবল অভিজাতদের অধিকারে সীমাবদ্ধ ছিল, তবুও পরবর্তী শতকে এটি হয়ে উঠেছিল দেশের আইনত শাসনের ভিত্তি,নির্বাহী ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ ও সংসদের ধারণা প্রতিষ্ঠায় প্রেরণাসূত্র।
১৯৪১ সালের আটলান্টিক সনদ আরেকটি দৃষ্টান্ত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসের মাঝে দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রনেতারা যে নীতিমালার ঘোষণা দেন, তাতে ছিলো স্বনির্ধারণ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, নিরস্ত্রীকরণ এবং একটি ন্যায্য ও শান্তিপূর্ণ বিশ্বগঠনের আশ্বাস। যদিও এটিও ছিল আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়, তবুও এর নৈতিক প্রতিধ্বনি যুগান্তকারী জাতিসংঘ গঠনের নীতিগত ভিত্তি হয়ে ওঠে এই সনদ।
বাংলাদেশের নিজস্ব ইতিহাসেও রয়েছে এমন দলিলের ঔজ্জ্বল্য। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে সনদ হিসেবে ঘোষিত হয়নি, কিন্তু এটি ছিল একটি পরিপূর্ণ রাজনৈতিক ইশতেহার এবং পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের জন্য একটি স্পষ্ট রূপরেখা। তেমনি ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার ঘোষণাও কেবল মুক্তিযুদ্ধের আহ্বান ছিল না, বরং ছিলো একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিপ্রস্তর। এই দলিলগুলো এসেছে নানান সময়ে নানান প্রতিরোধ ও সংকটের গভীরতা থেকে যখন প্রচলিত ব্যবস্থাগুলো আর জনগণের আকাঙ্ক্ষা ধারণে সক্ষম ছিল না।
জুলাই সনদ এই ধারাবাহিকতারই সমসাময়িক রূপ।এই সময়ে দাঁড়িয়ে সনদটির গুরুত্ব এখন অনেক বেশি। এই সনদ এমন এক সময়ে রচিত হচ্ছে, যখন দেশের সর্বস্তরে হতাশা, দিশাহীনতা ও অনিশ্চয়তা ঘিরে ধরেছে জনগণকে। রাজনৈতিক অবিশ্বাস, প্রাতিষ্ঠানিক ভাঙন ও নৈতিক অবক্ষয়ের সময়ে দাঁড়িয়ে এই দলিল যেন একটি নবচেতনার নতুন রাষ্ট্রের রূপরেখা।
‘জুলাই সনদ’-কে আমাদের কেবল একটি ক্ষমতার হস্তান্তর নথি হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি হতে হবে সেই মূলনীতি ও মূল্যবোধের দলিল, যা দিয়ে আগামী দিনের বাংলাদেশ তার পথ খুঁজে নেবে। সেই বাংলাদেশ, যেখানে মুক্তিযুদ্ধ ও গণ-অভ্যুত্থানে শহিদ হওয়া প্রত্যেকটি প্রাণের যথাযথ স্বীকৃতি থাকবে; থাকবে চব্বিশে পঙ্গু হয়ে যাওয়া সংগ্রামীদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা। যেখানে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা থাকবে সমান; আইনের চোখে কেউ হবে না শ্রেণিভেদে উঁচু-নিচু, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা হবে শাসনের মূল চালিকা শক্তি। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো থাকবে দলীয় নিয়ন্ত্রণ ও সরকারি হস্তক্ষেপমুক্ত, তারা চলবে নিজেদের বিধিবদ্ধ নিয়ম ও নীতির আলোকে। জুলাই সনদ আমাদের সেই ভিত্তি নির্মাণের আহ্বান জানায় এমন একটি রাষ্ট্রের, যার মূলভিত্তি হবে ন্যায়, স্বাধীনতা এবং জনগণের প্রতি দায়িত্বশীলতা। কারণ একটি রাষ্ট্র কেবল তখনই টেকে, যখন তার ভিত্তি হয় ন্যায়, জবাবদিহিতা ও স্বাধীনতার উপর প্রতিষ্ঠিত।
হ্যাঁ,একটি সনদ যতই আদর্শনির্ভর হোক, তা তখনই কার্যকর হয় যখন তা বাস্তব রাজনীতির মাটি ছুঁতে পারে। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বহুদিন ধরে এক ধরনের প্রতিহিংসাপরায়ণতা ও দলীয় অহমিকা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ‘জুলাই সনদ’ যদি এই প্রচলিত কাঠামোতে নিজেকে মানিয়ে নিতে চায়, কিংবা একে যদি শুধুই দলীয় সমঝোতার প্রলেপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়,তাহলে এটি ইতিহাসের পাতায় একটি ব্যর্থ সম্ভাবনা হয়েই রয়ে যাবে।
আমাদের এখনও সময় আছে, এখনও সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা যদি এই সনদকে শুধুমাত্র কাগজের লেখা না ধরে, বরং একটি জীবন্ত রাজনৈতিক দলিল হিসেবে গণ্য করি–যার পেছনে আছে জনগণের অংশগ্রহণ, তীব্র আন্দোলনের ইতিহাস ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন তাহলে এটি একটি নৈতিক রাষ্ট্রের ভিত্তি হতে পারে। এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে থাকবে না স্বৈরশাসকের মতো প্রতিপক্ষ দলকে দমন-পীড়ন, বিচারহীনতা বা রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসা। যেখানে সিদ্ধান্ত হবে জনতার অংশগ্রহণে, আর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হবে জনগণের কল্যাণে ব্যবহৃত একটি বাহন। জুলাই সনদকে যদি বাস্তবিকভাবে এভাবেই প্রয়োগ করা যায় তাহলে অনেকটা আমাদের স্বপ্নের মতো একটি নতুন বাংলাদেশ গড়া সম্ভব।
এই দায়িত্ব কেবল রাজনীতিকদের একার নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, শ্রমিক-কৃষক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, আইনজীবী-সমাজের প্রতিটি সচেতন শ্রেণিকে এই আলোচনায় যুক্ত হতে হবে। ‘জুলাই সনদ’ শুধু রাজনৈতিক বক্তৃতায় উচ্চারিত হলে চলবে না; এটিকে সফল করতে হলে লিঙ্ক একে নিয়ে আলোচনা হতে হবে চায়ের আড্ডায়, টাউন হলের আলোচনায়, পাঠাগারে, এমনকি নাট্যমঞ্চেও। তাহলে সম্মিলিতভাবে তাদের স্বপ্নের রাষ্ট্রগড়ার জন্য মূল ভিত্তি পাবে। তাহলে গণ-অভ্যুত্থান থেকে তৈরি হওয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। রাজনীতিবিদরা এ বিষয়ে ঐক্যমত্যে না পৌছালে প্রয়োজনে জনগনের চাপে জুলাই সনদে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য ও সরকার হস্তক্ষেপ করতে পারবে। জনতার চোখে এই সনদকে তাদের স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি হিসেবে তুলে ধরতে হবে—তবেই এটি বাস্তব রূপ লাভ করতে পারবে। অন্যথায়, ‘জুলাই সনদ’ হয়ে থাকবে কেবল একটি ঘোষণা, যার আলোর রেখা জনজীবনে পৌঁছাবে না।
২০২৪ সালে জলাই-আগস্ট মাসে সম্মিলিতভাবে দেশকে স্বৈরাচারের হাত থেকে মুক্ত করে দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন দেখা হয়েছিল বর্তমান পরিস্থিতি তার থেকে অনেক দূরে আছে। বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এমন এক সময় পার করছে, যা অনেকটা সাজানো ধ্বংসস্তূপের মতো নিরাপত্তাহীন, অনাস্থাভরা ও গভীর অনিশ্চিত। কিন্তু ইতিহাস আমাদের শেখায় রেনেসাঁর জন্ম হয় ধ্বংস অনিশ্চয়তার ভিতর দিয়েই। ঠিক তেমনি,‘জুলাই সনদ’ হতে পারে ২৪এর গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আমাদের জাতীয় পুনর্জাগরণের প্রথম ধাপ। এটি হতে পারে একটি নতুন শুরু, যদি আমরা সাহস করি কল্পনা করতে, সাহস করি ঐক্য গড়তে, এবং সাহস করি নতুন বন্দোবস্তের জন্য এই সনদের বাস্তবায়নের জন্য লড়তে। তাহলেই আমরা আমাদের আকাঙ্ক্ষার মত সুন্দর স্বপ্নের মতো একটি রাষ্ট্র পাবো।
মো: হাবিবুল্লাহ বাহার, শিক্ষার্থী আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। habibullahbahar964@gmail

