বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে একতাই অস্ত্র

Author

মো হাবিবুল্লাহ বাহার , রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ১১ মার্চ ২০২৫ পাঠ: ৪৯ বার

চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে “একতাই” অস্ত্র (প্রকাশিত, ১১মার্চ,আমার দেশ পত্রিকা)
চাঁদাবাজি শুধু একটি শব্দ নয়, বরং আমাদের সমাজের একটি ভয়ানক ব্যাধি, যা বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একটি ভয়ানক বড় সংস্কৃতির অংশ হিসেবে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দ্বিতীয় স্বাধীনতা অর্জিত হওয়ার পর কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, ড্রাইভার থেকে শুরু করে শিল্পপতি পর্যন্ত আপামর জনতার মধ্যে একটি বড় আশা ছিল, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, খুন ও ধর্ষণমুক্ত নতুন একটি বাংলাদেশ গড়ার। সবাই চেয়েছিল এমন একটি দেশ যেখানে সবাই শান্তিপূর্ণভাবে জীবনযাপন করতে পারবে এবং চাঁদাবাজি, ছিনতাই, গুম, খুন আর ধর্ষণের মতো অবিচার ও অপরাধের শিকার হবে না।
কিন্তু আজকাল, সোশ্যাল মিডিয়া খুললেই আমাদের নিউজফিডে চাঁদাবাজি,খুন আর ধর্ষণের খবরগুলোই বেশি ঠাঁই পাচ্ছে। পেপার পত্রিকাগুলোতেও একই ধরণের দৃশ্যগুলো প্রতীয়মান। যা খুবই দুঃখজনক ও উদ্বেগের কারণ। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর যে বাংলাদেশটি স্বাধীনতা ও শোষণহীন সমাজের স্বপ্ন দেখেছিল, আজ তা এই অপকর্মগুলোর মধ্য দিয়ে বিবেকহীন অপরাধ দ্বারা বেড়ে ওঠার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাঁদাবাজির পরিস্থিতিটি দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা অনুযায়ী কখনো কম, কখনো বা অনেক বেশি হয়ে থাকে। ৫ই আগস্ট ফ্যাসিবাদের পতনের পর থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত ক্রমান্বয়ে এই ব্যাধি দেশের প্রত্যেকটি জায়গায় এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে, আজ সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বড় ব্যবসায়ী পর্যন্ত কেউই এর কবল থেকে রেহাই পাচ্ছে না।
ক্ষুদ্র দোকানিও যখন সকালে দোকান খুলতে যায়, তখন হয়তো তার মনে একটা ভয় কাজ করে “আজ কেউ চাঁদা চাইতে আসবে না তো?” ঠিক একজন ভবন নির্মাণকারী বা গাড়ির মালিকও একই চিন্তা ও উদ্বিগ্নতার মধ্যে দিয়ে দিন পার করে। আবার বাসায় ফেরার সময় একই চিন্তা কাজ করে, “আমার সাথে যা কিছু আছে তা ডাকাতদের দ্বারা ছিনতাই হয়ে যাবেনা তো?” কারণ এখন চাঁদাবাজি ও ছিনতাইয়ের মাত্রা দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে খুব প্রকট আকার ধারণ করেছে।
চাঁদাবাজরা কখনো রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে, কখনো সন্ত্রাসী বাহিনীর ভয় দেখিয়ে বা কখনো গোপনে হুমকি দিয়ে টাকা দাবি করে। কেউ টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে শুরু হয় ভয়াবহ হুমকি-ধমকি, এমনকি প্রাণনাশের হুমকিও। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, অনেক সময় প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তিও এ অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এই চাঁদাবাজি সমাজকে শুধু অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং নতুন বাংলাদেশে নিঃশ্চিন্তে চলাফেরার অধিকার ও ন্যায়বিচারের মূল ভিত্তিটাকেই নাড়িয়ে দিচ্ছে। একজন মানুষ সাধারণত যখন বুঝতে শুরু করে যে, চাঁদা না দিলেই সমস্যা, তখন তারা চুপচাপ টাকা দিয়ে দেয়। আমাদের এই টাকা দেয়াটাই অপরাধের মূল কারণ। এই সুযোগে চাঁদাবাজরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। কিন্তু একবার ভেবে দেখুন! এভাবে কি এই নতুন বাংলাদেশে চলতে দেওয়া যায়? কতদিন এ অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে থাকব আমরা? চাঁদাবাজি যদি সমাজে ছড়িয়ে যায়, তাহলে একদিন আমরা সবাই-ই তাদের কাছে অনিরাপদ হয়ে পড়ব। তাই এখনই প্রয়োজন চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সোচ্চার হওয়ার। আর এই দাঁড়ানো একা একা সম্ভব নয়; প্রয়োজন আমাদের “একতা”। কারণ একতাই পারে সকলের ভয়কে জয় করতে, অন্যায়কে রুখে দিতে।
এখন সমাজে নানা অপরাধের মধ্যে চাঁদাবাজি এমন একটি অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা প্রতিদিনের জীবনে মানুষের কাঁধে বোঝা হয়ে চেপে বসে। এগুলোর প্রতিরোধে আমাদের পারস্পরিক সচেতনতা ও একতা বৃদ্ধি করতে হবে। বর্তমান সময়ের একটি বাজারের উদাহরণ ধরা যাক। মনে করেন বাজারে প্রতিদিন চাঁদাবাজরা এসে দোকানদারদের কাছ থেকে টাকা দাবি করে। দোকানদাররা বাধ্য হয়ে টাকা দেয়। কারণ তারা জানে, টাকা না দিলে পরদিন দোকানের সামনে ভাঙচুর হবে, পণ্য লুট হবে, বাড়ি ফেরার পথে ছিনতাইও হতে পারে। অথচ সেই বাজারের দোকানদাররা যদি একজোট হয়ে প্রতিবাদ করতো, তবে কি চাঁদাবাজরা এভাবে সহজে সকলের কাছ থেকে টাকা তুলতে পারত? একদমই না। এগুলোর বিরুদ্ধে একসাথে দাঁড়ালে যেমন সাহস বাড়ে, তেমনি অন্যায়ের শক্তি কমে যায়।
ইতিহাসে দেখা যায়, যেখানে মানুষ একত্রিত হয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, সেখানেই জয় এসেছে। যেখানে সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো, ৫-ই আগস্টের আগে আমরা সবাই ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনে একতাবদ্ধ ছিলাম, যার কারণে ১৬ বছরের ক্ষমতাধর স্বৈরাচারের পতন ঘটেছে। কিন্তু ৫-ই আগস্টের পরে সবাই নিজ নিজ দল কিংবা ভিন্ন ভিন্ন ইস্যুতে বিভক্ত হয়ে পড়েছি। যার কারণে কয়েক মাস আগে আমরা ১৬ বছরের ফ্যাসিস্টের পতন ঘটাতে পারলেও এখন নিজেদেরকে রক্ষাও করতে পারতেছি না। সুতরাং আমাদের মনে রাখতে হবে যেখানেই বিভক্তি ছিল, সেখানেই অন্যায় মাথাচাড়া দিয়েছে। চাঁদাবাজ কিংবা ছিনতাইকারীরা ও সেই একই মানসিকতা নিয়ে কাজ করে। তারা জানে, মানুষ এক থাকলে তারা তাদের এই সন্ত্রাসী কার্যক্রম করতে পারবেনা, ভয় পাবে। তাই মানুষকে ভয় দেখিয়ে আলাদা করার চেষ্টা করে। একজন চাঁদা দিতে না চাইলে তারা বলে, “তুমি না দিলে অন্যরা দেবে, তখন তুমিই বিপদে পড়বে!” এই ভয় দেখানোই তাদের প্রধান অস্ত্র। কিন্তু ভেবে দেখুন, যদি সবাই একসাথে বলে, “আমরা কেউ চাঁদা দেব না,” তখন কি তারা সেই সাহস দেখাতে পারবে? কখনোই নয়।
প্রশ্ন হলো আমাদের মাঝে এই একতা তৈরি হবে কীভাবে? প্রথমেই প্রয়োজন আমাদের সচেতনতা। আমাদের বুঝতে হবে, চাঁদাবাজিকে মেনে নেওয়া মানে অপরাধকে প্রলম্বিত করা। যখন আমরা টাকা দিই, তখন অপরাধীরা আরও সাহস পায়। তাই প্রথম কাজ হলো নিজের মধ্যে বিভিন্নভাবে পারস্পরিক সচেতনতা তৈরি করা। দ্বিতীয়ত, ভয় দুূর করা ও আশেপাশের মানুষকে বোঝানো যে, “একসাথে থাকলেই আমরা নিরাপদ।” একজন প্রতিবাদ করলে হয়তো চাঁদাবাজরা তাকে ভয় দেখাবে, কিন্তু দশজন একসাথে প্রতিবাদ করলে আপনাদেরকে চাঁদাবাজরাই ভয় পাবে। কেও একজন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে সমাজ ও দেশ রক্ষা করার জন্য আমাদেরকে তার পাশে দাড়াতে হবে। সুতরাং এখনই সময় নিজ নিজ জায়গা থেকে একতাবদ্ধ ভাবে সোচ্চার হওয়ার। তৃতীয়ত, প্রশাসনের সহায়তা নেওয়া। অনেকেই মনে করে, থানায় অভিযোগ করে লাভ নেই। কিন্তু যদি একসাথে সবাই মিলে যায়, প্রশাসনও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে বাধ্য হয়।
একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করলে নিজেদের মাধ্যমে বিভিন্নভাবে ঐক্য গড়ে তুললে যে এটির ফলাফল খুব দ্রুতই ভোগ করা যায় যার জন্য রাজধানীর একটি বাজারের উদাহরণ দেওয়া যায়। কয়েক বছর আগে সেখানে প্রতিদিন চাঁদাবাজরা এসে দোকানদারদের কাছ থেকে টাকা তুলত। কেউ মুখ খুলতে সাহস পেত না। একদিন এক ব্যবসায়ী উদ্যোগ নিলেন। তিনি অন্যান্য দোকানদারদের ডেকে বললেন, “চুপ থাকলে আমরা আরও সমস্যায় পড়ব। আমাদের একসাথে প্রতিবাদ করতে হবে।” প্রথমে অনেকেই ভয় পেলেও ধীরে ধীরে সবাই সাহস পেল। তারা মিলে থানায় অভিযোগ করল, বাজারে সিসি ক্যামেরা বসাল, এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধির সহায়তা চাইল। ফলাফল? এক সপ্তাহের মধ্যেই চাঁদাবাজি বন্ধ হয়ে গেল। এ ঘটনা প্রমাণ করে একতার শক্তি কতটা কার্যকর এবং কত দ্রূত অন্যায়কেও থামিয়ে দিতে পারে।
তবে শুধু আইন বা প্রশাসনই সমাধান নয়। আমাদের মানসিকতাও বদলাতে হবে। অনেকেই ভাবে, “টাকা দিয়ে সমস্যা মিটাই, ঝামেলায় যাই কেন?” কিন্তু মনে রাখতে হবে, আজ আপনি চুপ থাকলে কাল আরও বড় সমস্যা আসবে। চাঁদাবাজি আর ছিনতাই এগুলো শুধু আমার আপনার একাট না, পুরো সমাজের সমস্যা। তাই এর সমাধানও সবাইকে মিলেই করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে এখন সচেতনতা ছড়ানো খুব সহজ। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপে চাঁদাবাজির ঘটনা জানিয়ে সবাইকে সতর্ক করা যায়। এমনকি ভিডিও প্রমাণ থাকলে তা প্রশাসনের কাছে জমা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।
সবচেয়ে বড় কথা হলো একতার মধ্য দিয়ে আমাদের ভয়কে জয় করতে হবে। চাঁদাবাজরা যত শক্তিশালীই হোক, মানুষ এক হলে কোনো শক্তিই তাদের থামাতে পারবে না। যেমনভাবে একটি কাঠির বান্ডিল একসাথে থাকলে ভাঙা যায় না, তেমনি আমরা এক থাকলে অন্যায়ও আমাদের ভাঙতে পারবে না। একতার শক্তি শুধু কথার কথা নয়, বরং এটি বাস্তবের এক নির্ভরযোগ্য শক্তিশালী অস্ত্র।
আজ আমাদের সমাজে যে চাঁদাবাজি আর ছিনতাইয়ের ভয়াল ছাঁয়া নেমে এসেছে, তা দূর করতে হলে এখনই সময় পদক্ষেপ নেওয়ার। আর সেই পদক্ষেপের প্রথম শর্ত হলো “ঐক্য”। আমরা যদি একসাথে দাঁড়াই, অন্যায় থামবে, সমাজে শান্তি ফিরবে। তাই আসুন, ভয় নয়, নীরবতাও নয়, এখনই প্রতিবাদে মুখর হই। মনে রাখবেন, “চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে একতা আমাদের অস্ত্র” এ অস্ত্র আমরা সবাই মিলে ব্যবহার করলেই পরিবর্তন আসবে, এবং আসবেই।
মো: হাবিবুল্লাহ বাহার। আরবী বিভাগ,রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

লেখক: প্রচার সম্পাদক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১১ মার্চ ২০২৫ তারিখে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!