বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

বৃষ্টির জল সংরক্ষণ ও পুনর্ব্যবহার

Author

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশ: ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পাঠ: ৮ বার

বৃষ্টির জল সংরক্ষণ ও পুনর্ব্যবহার

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। আবার এটি বিশ্বের অন্যতম বর্ষাপ্রবণ দেশ হিসেবেও পরিচিত । প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে বিপুল পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই মূল্যবান বৃষ্টির অধিকাংশ পানি কোনো পরিকল্পিত সংরক্ষণ ছাড়াই নদী, খাল-বিল ও সাগরে চলে যায়। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা দেয় নিরাপদ পানির সংকট। কোথাও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে, কোথাও আর্সেনিক বা লবণাক্ততার কারণে নিরাপদ পানির উৎস সীমিত হয়ে পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই সংকট ধীরে ধীরে আরও জটিল হচ্ছে। তাই বৃষ্টির জল সংরক্ষণ ও পুনর্ব্যবহার এখন আর শুধু পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ নয়; বরং এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কোথাও অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যা, আবার কোথাও দীর্ঘস্থায়ী খরা মানুষের জীবন ও অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বাংলাদেশও এই পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে। সিলেট অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা, উত্তরাঞ্চলে খরার প্রবণতা এবং উপকূলে লবণাক্ততার বিস্তার প্রমাণ করে যে, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় নতুন চিন্তার সময় এসেছে। সেই নতুন চিন্তার অন্যতম ভিত্তি হতে পারে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ বা রেইনওয়াটার হারভেস্টিং। রেইনওয়াটার হারভেস্টিং বলতে ছাদ, খোলা আঙিনা বা অন্যান্য উপযুক্ত স্থান থেকে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে ট্যাংক, জলাধার কিংবা ভূগর্ভস্থ সংরক্ষণ ব্যবস্থায় জমা রাখাকে বোঝায়। পরিশোধনের মাধ্যমে এই পানি পানীয়, রান্না, ধোয়া-মোছা, বাগান পরিচর্যা, শিল্পকারখানা কিংবা কৃষিকাজে ব্যবহার করা যায়। একই সঙ্গে অতিরিক্ত পানি রিচার্জ পিটের মাধ্যমে মাটির নিচে পাঠিয়ে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরুদ্ধার করাও সম্ভব। অর্থাৎ এই প্রযুক্তি একদিকে পানির অপচয় রোধ করে, অন্যদিকে ভবিষ্যতের জন্য পানির ভাণ্ডার গড়ে তোলে। বাংলাদেশে বর্তমানে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন শহরে প্রতিদিন হাজার হাজার গভীর নলকূপ থেকে পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দেশের বহু এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাচ্ছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে নিরাপদ পানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যাপকভাবে চালু করা গেলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর এই অতিরিক্ত চাপ কমানো সম্ভব। ইউনেস্কো প্রকাশিত বিশ্ব পানি উন্নয়ন প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বজুড়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নিরাপদ পানির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। প্রতিবেদনটি টেকসই পানি ব্যবস্থাপনাকে ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অন্যতম শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছে। বাংলাদেশেও দ্রুত নগরায়ণের ফলে প্রতিদিন পানির চাহিদা বাড়ছে। অথচ বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের সংস্কৃতি এখনও ব্যাপকভাবে গড়ে ওঠেনি। অধিকাংশ ভবনের ছাদ থেকে বৃষ্টির পানি সরাসরি ড্রেনে চলে যায়। এটি শুধু পানির অপচয়ই নয়, বরং নগর জলাবদ্ধতারও একটি কারণ। কৃষিক্ষেত্রেও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের গুরুত্ব বর্তমানে খুবই জরুরি। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা -এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট মিঠাপানির প্রায় ৭০ শতাংশ কৃষিখাতে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশেও বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদনে বিপুল পরিমাণ সেচের প্রয়োজন হয়। যদি বর্ষার পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে সেচের কাজে ব্যবহার করা যায়, তাহলে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমবে, কৃষকের সেচ ব্যয় হ্রাস পাবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় কৃষি আরও সহনশীল হয়ে উঠবে। স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের গুরুত্ব কম নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিরাপদ পানিকে জনস্বাস্থ্যের অন্যতম মৌলিক শর্ত হিসেবে বিবেচনা করে। যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও পরিশোধন করা গেলে বৃষ্টির পানি নিরাপদভাবে ব্যবহার করা সম্ভব। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের অনেক পরিবার বহু বছর ধরে বর্ষার পানি সংরক্ষণ করে পানীয় হিসেবে ব্যবহার করছে। লবণাক্ততার কারণে যেখানে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করা কঠিন, সেখানে বৃষ্টির পানি মানুষের জীবনরক্ষাকারী সম্পদে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণকে জাতীয় নীতির অংশ করেছে। সিঙ্গাপুর সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের পানির নিরাপত্তা জোরদার করেছে। পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের তামিলনাড়ু, কর্ণাটকসহ কয়েকটি রাজ্যে নতুন ভবনে রেইনওয়াটার হারভেস্টিং বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের অনেক শহরেও এই প্রযুক্তি সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশেও পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে বাস্তবায়নের পথে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অনেক মানুষ এখনও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন নন। নতুন ভবন নির্মাণের সময় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ব্যবস্থা রাখা হয় না। স্থানীয় পর্যায়ে কারিগরি সহায়তা ও প্রশিক্ষণেরও ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া নীতিমালা থাকলেও তার কার্যকর বাস্তবায়ন সব সময় নিশ্চিত হয় না। ফলে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এই প্রযুক্তি এখনও সীমিত পরিসরে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। নতুন সরকারি ও বেসরকারি ভবনে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে পানি সংরক্ষণ ও জলবায়ু অভিযোজন বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে সহজ ও স্বল্প ব্যয়ের প্রযুক্তি জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। শিল্পকারখানা ও আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর-সুবিধা বা প্রণোদনা দিয়ে এই ব্যবস্থা গ্রহণে উৎসাহিত করা যেতে পারে। পাশাপাশি গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি-৬) ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তা অর্জনে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ অত্যন্ত কার্যকর একটি উপায়। একই সঙ্গে এটি এসডিজি-১১ (টেকসই নগর), এসডিজি-১৩ (জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা) এবং এসডিজি-১৫ (স্থলজ বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ)-এর লক্ষ্য অর্জনেও সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। পানি ভবিষ্যতের সবচেয়ে মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদগুলোর একটি। আজ যে বৃষ্টির পানি আমরা অবহেলায় অপচয় করছি, আগামী দিনের পানি সংকট মোকাবিলায় সেটিই হতে পারে সবচেয়ে বড় পরিপূরক। তাই বৃষ্টির জলকে কেবল ঋতুর সৌন্দর্য হিসেবে নয়, বরং জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। ব্যক্তিগত উদ্যোগ, সামাজিক সচেতনতা, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা এবং কার্যকর সরকারি নীতির সমন্বয়ে যদি বৃষ্টির জল সংরক্ষণ ও পুনর্ব্যবহারকে জাতীয় আন্দোলনে রূপ দেওয়া যায়, তবে বাংলাদেশ ভবিষ্যতের পানি সংকট মোকাবিলায় অনেকটাই প্রস্তুত হতে পারবে।
লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে সময়ের আলো পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।