বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন
হোম / ইসলাম / নিবন্ধ

হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ এক রাত

Author

মোঃ তারেক খান , খাজা ইউনুস আলী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২৬ পাঠ: ২৫৬ বার

রমজান মাস মুসলমানদের জন্য রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। এই মাসের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক মহিমান্বিত রাত– লাইলাতুল কদর। আরবি শব্দ লাইলাতুল অর্থ রাত এবং কদর অর্থ মর্যাদা, মহিমা বা সম্মান। সে অর্থে লাইলাতুল কদর মানে মহিমান্বিত বা সম্মানিত রাত। অনেক সময় আমরা ফার্সি শব্দ “শাব” ব্যবহার করে একে “শবে কদর” বলেও উল্লেখ করি, যার অর্থও একই– মর্যাদার রাত।

 

এই রাতটি এত মহিমান্বিত হওয়ার মূল কারণ হলো এ রাতেই নাজিল হয়েছে মানবজাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ দিকনির্দেশনা আল-কোরআন। মহান আল্লাহ তাআলা সূরা দুখানের তৃতীয় আয়াত এবং সূরা কদরের প্রথম আয়াতে ঘোষণা করেছেন যে, তিনি এই মহিমান্বিত রাতেই কোরআন নাজিল করেছেন। ফলে এই রাত শুধু একটি বিশেষ রাতই নয়; বরং মানব ইতিহাসে পথনির্দেশনার সূচনালগ্ন হিসেবে এর মর্যাদা অপরিসীম।

 

লাইলাতুল কদর বছরের অন্যান্য রাতের মতো নয়, এমনকি রমজানের বাকি রাতগুলোর চেয়েও এটি অসীম মর্যাদাপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা নিজেই ঘোষণা করেছেন, “লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।” (সূরা কদর, আয়াত ৩)। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসিরকারগণ বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন।

 

তাফসীরে ইবনে কাসীর এবং তাফসীরে মা’আরেফুল কোরআনে একটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়, বানী ইসরাঈলের একজন ব্যক্তি সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত আল্লাহর ইবাদত করতেন এবং দিনের বেলায় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দ্বীনের শত্রুদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতেন। এভাবে তিনি টানা এক হাজার মাস কাটিয়ে দেন। তখন আল্লাহ তাআলা এই সূরা অবতীর্ণ করে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর উম্মতকে সুসংবাদ দেন যে, এই উম্মতের কেউ যদি লাইলাতুল কদরে ইবাদত করে, তবে সে ওই ব্যক্তির দীর্ঘ ইবাদতের চেয়েও অধিক সওয়াব লাভ করতে পারে।

 

কিছু তাফসিরকারক আবার “হাজার মাস”কে গাণিতিক হিসাবেও ব্যাখ্যা করেছেন। তাদের মতে, এক হাজার মাস আশি বছরেরও অধিক। অর্থাৎ এ রাতে ইবাদত করলে আশি বছর ইবাদত করার চেয়েও বেশি সওয়াব পাওয়া যায়। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে বর্ণিত আছে যে, একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) বানী ইসরাঈলের চারজন মহান ইবাদতকারীর কথা উল্লেখ করেন– হযরত আইউব (আ.), হযরত যাকারিয়া (আ.), হযরত হাযকীল ইবনে আ’জয (আ.) এবং হযরত ইউশা ইবনে নুন (আ.)। তারা আশি বছর পর্যন্ত অবিরাম আল্লাহর ইবাদত করেছেন এবং এ সময়ের মধ্যে কোনো নাফরমানি করেননি। এ কথা শুনে সাহাবিগণ বিস্মিত হলে হযরত জিবরাঈল (আ.) এসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জানান যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর উম্মতকে এর চেয়েও উত্তম নিয়ামত দান করেছেন। আর সেটিই হলো লাইলাতুল কদর।

 

অন্যদিকে তাফসীর “ফি যিলালিল কোরআন”-এর লেখক শহীদ সাইয়েদ কুতুব (রহ.) বলেন, এখানে “হাজার মাস” দ্বারা নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বোঝানো হয়নি; বরং বিপুলতার ধারণা প্রকাশ করা হয়েছে। অর্থাৎ মানুষের জীবনে এমন কোনো দীর্ঘ সময় নেই, যার চেয়েও এই একটি রাত অধিক মূল্যবান নয়। এই রাতেই মানব ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা ঘটেছে। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি ওহী অবতীর্ণ হয়েছে, তাঁকে মানবজাতির নেতা হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে এবং নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানবতার মুক্তির দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।

 

তাফহীমুল কুরআনের লেখক সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী (রহ.)-ও প্রায় একই ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, এখানে “হাজার মাস” বলতে নির্দিষ্ট সময় গণনা বোঝানো হয়নি। আরবদের ভাষারীতিতে বিপুলতা বোঝাতে “হাজার” শব্দ ব্যবহৃত হতো। অর্থাৎ এই একটি রাতে যে মহান কল্যাণকর কাজ সংঘটিত হয়েছে, মানব ইতিহাসের দীর্ঘতম সময়েও তেমন কিছু ঘটেনি।

 

হাদিসে বর্ণিত আছে, রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোর মধ্যে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করতে হবে। রাসুল (সা.) বলেছেন, “তোমরা রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান কর।” (সহিহ বুখারি)। অর্থাৎ ২১, ২৩, ২৫, ২৭ অথবা ২৯– এই রাতগুলোর যেকোনো একটি হতে পারে লাইলাতুল কদর।

 

প্রশ্ন জাগতে পারে, কেন আল্লাহ তাআলা এই মহিমান্বিত রাতটি নির্দিষ্ট করে জানাননি? এর পেছনেও রয়েছে গভীর প্রজ্ঞা। যদি একটি রাত নির্দিষ্ট করে দেওয়া হতো, তাহলে অনেক মানুষ হয়তো কেবল সেই রাতেই ইবাদত করত। কিন্তু এখন শেষ দশকের একাধিক রাতে মানুষ ইবাদতে মনোনিবেশ করে। ফলে তাদের আমলনামায় অধিক সওয়াব যুক্ত হয় এবং ইবাদতের পরিধিও বৃদ্ধি পায়।

 

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরে নামাজে দাঁড়াবে, তার পূর্বের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)।

 

তাই আমাদের উচিত রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে অধিক আন্তরিকতার সঙ্গে ইবাদতে মনোযোগী হওয়া। নফল নামাজ আদায়, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার এবং বেশি বেশি তাওবা-ইস্তিগফারের মাধ্যমে এই রাতকে মূল্যবান করে তোলা। বিশেষভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়াটি বেশি বেশি পড়া উচিত– “আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি।”

 

অর্থ: “হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, তাই আমাকে ক্ষমা করে দিন।” (সুনানে তিরমিজি)

 

লাইলাতুল কদর তাই শুধু একটি রাত নয়; এটি আল্লাহর অশেষ রহমত ও ক্ষমার এক অপার সুযোগ। যে ব্যক্তি আন্তরিকতার সঙ্গে এই রাতের সন্ধান করবে এবং ইবাদতের মাধ্যমে তা কাজে লাগাবে, তার জন্য এই রাত হতে পারে জীবন পরিবর্তনের এক অনন্য মুহূর্ত।

লেখক: সহ-সভাপতি, সমন্বিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!