রবীন্দ্রনাথ-রজনীকান্ত এক অনন্য যোগসূত্র
https://epaper.bd-bulletin.com/share.php?q=2026/08/02/4/details/4_r5_c3.jpg
https://www.khaborerkagoj.com/literary-society/930756
রবীন্দ্রনাথ-রজনীকান্ত এক অনন্য যোগসূত্র
জুলাই মাসের ২৬ তারিখ ছিল কান্তকবি রজনীকান্ত সেনের ১৬১তম জন্মবার্ষিকী। বাংলা সাহিত্যের পঞ্চকবির অন্যতম এই ক্ষণজন্মা কবির জন্মবার্ষিকী আমাদের আবারও স্মরণ করিয়ে দেয় তার সাহিত্যসাধনা, জীবনসংগ্রাম এবং সমসাময়িক মহাপুরুষদের সঙ্গে তার হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কের কথা। বাংলা সাহিত্য ও সংগীতের ইতিহাসে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কান্তকবিরজনীকান্ত সেনের সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অনুরাগ এবং প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। জন্মবার্ষিকীর এই ক্ষণে সেই সম্পর্কেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে আমরা অবগাহন করে আসি। ‘ভালোবাসেন জানি, তাই এত কথা বললাম। কিছু মনে করবেন না।’ হাসপাতালে বিছানায় রোগশয্যাশায়ী রজনীকান্ত সেন উপস্থিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রশ্নের জবাবে এই উত্তর লিখে দিয়েছিলেন। সেই প্রসঙ্গে প্রবেশের পূর্বে বাংলা সাহিত্যের এই দুই অমর সাহিত্যিক সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়া আবশ্যক। বাংলা সাহিত্যের দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কান্তকবি রজনীকান্ত সেন- পঞ্চকবির পাঁচটি আসনের দুটি আসন অলংকৃত করে রয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃক রচিত মোট গানের সংখ্যা ২২৩২। তার গানের কথায় উপনিষদ, সংস্কৃত সাহিত্য, বৈষ্ণব সাহিত্য ও বাউল দর্শন গভীরভাবে উঠে এসেছে। অন্যদিকে রজনীকান্ত সেনের রচিত গানের সংখ্যা ২৯০। তার গানগুলি মূলত দেশাত্মবোধক, ভক্তিমূলক ও হাস্যরসাত্মক। বঙ্গভূমির এই দুই অমর পুরুষ বাংলা সাহিত্যকে করেছেন রসে ও ভাবনায় সমৃদ্ধ। রজনীকান্ত সেনের জন্ম ১৮৬৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ জুলাই এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দের ৭ মে। সেই হিসেবে রজনীকান্ত সেন রবীন্দ্রনাথের চেয়ে চার বছরের ছোট, অর্থাৎ তিনি রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িক। পঞ্চকবির আরেকজন কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়েরও তিনি সমসাময়িক কবি। কবিগুরুর প্রতি কান্তকবির ছিল অসীম শ্রদ্ধা, ভক্তি ও ভালোবাসা। কান্তকবির তৃতীয় প্রকাশিত গ্রন্থ ‘অমৃত’। এই গ্রন্থটি তিনি রবীন্দ্রনাথের ‘কণিকা’র আদর্শে রচনা করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে হাসপাতালে দেখতে আসা রবীন্দ্রনাথকে কবি বলেছিলেন-“কণিকার আদর্শে ‘অমৃত’ লিখেছি। লিখে ধন্য হয়েছি-ঐ আদর্শে লিখে ধন্য হয়েছি।” উল্লেখ্য, তখন রজনীকান্ত বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। রাজশাহীর থিয়েটারে রজনীকান্ত একবার রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা ও রাণী’ নাটকে রাজার ভূমিকায় দক্ষতার সঙ্গে অভিনয় করেন। হাসপাতালে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কবির শেষ সাক্ষাতের সময় এই প্রসঙ্গটিরও অবতারণা করেন কান্তকবি। রজনীকান্ত সেনের মেয়ে শান্তিলতা রায়ের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, কলকাতার হিন্দু হোস্টেলে থাকাকালীন সুধীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে রজনীকান্ত সেনের ঘনিষ্ঠ সখ্যতা তৈরি হয় এবং তার সঙ্গে হৃদ্যতা রজনীকান্তের শেষ দিন পর্যন্ত অটুট ছিল। সেই সূত্রে তিনি প্রায়ই জোড়াসাঁকোয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে যেতেন। রজনীকান্ত সেনের পিতা গুরুপ্রসাদ সেনের লেখা ‘পদচিন্তামণিমালা’ গ্রন্থটি একবার রজনীকান্ত রবীন্দ্রনাথকে দেখিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থটি পড়ে ভূয়সী প্রশংসা করেন। কান্তকবির জীবনীকার পণ্ডিত নলিনীরঞ্জন রচিত ‘কন্তকবি রজনীকান্ত’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ১৩১৫ বঙ্গাব্দের ২১ অগ্রহায়ণ, রবিবার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের নবগৃহপ্রবেশোৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছিল। রজনীকান্ত সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিজ্ঞাপন দেখে সেই সাহিত্য মন্দিরের মহতী সভায় যোগদানের জন্য কলকাতায় আসেন। ২০ অগ্রহায়ণ কলকাতায় পৌঁছে তিনি রায়সাহেব শ্রীযুক্ত দীনেশচন্দ্র সেনের আতিথ্য গ্রহণ করেন। পরদিন ২১ অগ্রহায়ণ, রবিবার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের নবগৃহপ্রবেশের দিন বাঙালির সারস্বত সাধনার শাশ্বতী প্রতিষ্ঠার মঙ্গলবাসর। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের নবনির্মিত গৃহে সেদিন দেশ-বিদেশ থেকে আগত অতিথিদের সমাগমে লোকে লোকারণ্য ছিল। অত্যধিক লোকসমাগমে দোতলা ও একতলায় দুটি পৃথক সভা করা হয়েছিল। একতলায় অনুষ্ঠিত সভার সভাপতিত্বে ছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রজনীকান্ত বিপুল জনতার ভিড় ভেদ করে দোতলায় উঠতে না পেরে একতলার সভাতেই যোগ দেন। এবং সেখানেই ঘটে রবীন্দ্র-কান্তের অন্তরঙ্গ সাক্ষাৎ। কবিগুরু কান্তকবির পরিচয় পেয়ে উপস্থিত সকল সাহিত্যঅনুরাগীর সঙ্গে রজনীকান্তের পরিচয় করিয়ে দেন। কবিগুরু রজনীকান্তকে গান গাইতে অনুরোধ করেন। কবিগুরুর অনুরোধে রজনীকান্ত স্বরচিত গান ‘সৃষ্টির বিশালতা’ এবং ‘সৃষ্টির সূক্ষ্মতা’ শীর্ষক দুটি গান পরিবেশন করেন। গান দুটি রজনীকান্তের ‘অভয়া’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। সেই সাক্ষাতেই রজনীকান্ত রবীন্দ্রনাথের আপন হয়ে ওঠেন। রবীন্দ্রনাথ তাকে নিজ বাড়িতে আসার আমন্ত্রণ জানান। পরদিন ২২ অগ্রহায়ণ, সোমবার সকালে দীনেশচন্দ্র সেনকে নিয়ে রজনীকান্ত কবিগুরুর গৃহে উপস্থিত হন। সেদিনও রজনীকান্তের কণ্ঠে কবিগুরু পূর্বোক্ত গান দুটি শোনেন। রজনীকান্তের এই ঘটনার স্মৃতিচারণ পাওয়া যায় তার হাসপাতালে লিখিত ডায়েরিতে। কান্তকবি লিখছেন-‘এই গান শুনে রবি ঠাকুর আমাকে তার সঙ্গে দেখা করতে বলেন। আমি দীনেশকে সঙ্গে করে রবিঠাকুরের বাড়ি পরদিন যাই। সেখানে তিনি আবার ঐ গান শোনেন, শুনে বলেন যে, বহির্জগৎ সম্বন্ধে বেশ হয়েছে, অন্তর্জগৎ সম্বন্ধে আর একটি করুন।’ ১৩১৬ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ মাস থেকে রজনীকান্তের গলায় ক্যান্সার রোগের সূত্রপাত হয়। অবস্থা ক্রমান্বয়ে খারাপ হতে থাকে। অস্ত্রোপচার করেও তেমন লাভ হয়নি। ক্রমে তিনি বাকশক্তি হারান। কবির স্বজনেরা তাকে কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কটেজের একটি কক্ষে (১২ ফেব্রুয়ারি ১৯১০, শনিবার) রাখেন। সেখানেই তার জীবনের অন্তিম দিনগুলি অতিবাহিত হয়। এই সময় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাকে দেখতে আসেন। রজনীকান্ত রোগাক্রান্ত শরীর নিয়ে হেঁটে গিয়ে কবিকে অভ্যর্থনা জানান এবং এটিই ছিল কবিগুরুর সাথে কান্তকবির শেষ সাক্ষাৎ। তারিখটি ছিল ১৩১৭ বঙ্গাব্দের ১৮ জ্যৈষ্ঠ। সেদিন রবীন্দ্রনাথের সব প্রশ্নের উত্তর রজনীকান্ত লিখে জানিয়েছিলেন।
